সিইও থেকে কর্মী

বড় মার্কিন কোম্পানিগুলোয় বেতনের ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) থেকে কর্মী পর্যন্ত গড় বেতনের ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) থেকে কর্মী পর্যন্ত গড় বেতনের ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। এসব কোম্পানি শীর্ষ কর্মকর্তাদের উচ্চ বেতনের পাশাপাশি স্টক বাইব্যাকের সুবিধা দিয়ে থাকে। অন্যদিকে নিচের দিকে পদগুলোয় বেতন বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির তুলনায় কম। বিশ্লেষকরা একে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুতর সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করছেন। কারণ বেতনের ব্যবধান কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ, অবমূল্যায়নের আশঙ্কা ও বিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি করছে। খবর দ্য হিল।

গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজ (আইপিএস) ‘এক্সিকিউটিভ এক্সেস ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে গত বছর সবচেয়ে বড় ১০০টি বেতনে উচ্চ ব্যবধানধারী কোম্পানিতে সিইওদের বেতন ও স্টক বাইব্যাক একসঙ্গে বেড়েছে।

গত বছরের সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর পর্যন্ত চার মাসে ৯ কোটি ৫৮ লাখ ডলার বেতনের প্যাকেজ পেয়েছিলেন স্টারবাকসের সিইও ব্রায়ান নিক্কল। অন্যদিকে এ পানীয় জায়ান্টের কর্মীদের বার্ষিক গড় বেতন ১৪ হাজার ৬৭৪ ডলার। প্রতিবেদন অনুসারে, উচ্চপদ থেকে নিম্নস্তরের এ বেতন ব্যবধান শুধু স্টারবাকস নয়, বড় কোম্পানিতে খুবই সাধারণ বিষয়।

গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত কোম্পানিগুলোয় ২০১৯-২৪ সালের মধ্যে গড়ে সিইওদের বেতন বেড়েছে ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ। অন্যদিকে গড় মধ্যম কর্মীর বেতন বৃদ্ধির হার ছিল ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ২২ দশমিক ৬ শতাংশ।

আইপিএসের প্রতিবেদন অনুসারে, গত ছয় বছরে এ ১০০ বৃহৎ কোম্পানির মধ্যে ৭৩টি স্টক বাইব্যাক বা পুনরায় শেয়ার ক্রয়ে বড় অংকের বিনিয়োগ করেছে। এ সময় শেয়ারদর বেড়ে যাওয়ায় স্টকভিত্তিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের আয় বেড়ে যায়। এতে কর্মীদের সঙ্গে তাদের আয়ের ব্যবধান বাড়তে থাকে।

নির্মাণ খাতের মার্কিন খুচরা প্রতিষ্ঠান লো’স ২০১৯-২৪ সালের মধ্যে সবচেয়ে বড় বাইব্যাক কর্মসূচি সম্পন্ন করে। ওই সময় শেয়ার পুনঃক্রয়ে কোম্পানির খরচ হয়েছে ৪৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ৬৬০ কোটি ডলার। ২০২৪ সালে লো’সের সিইও মার্ভিন এলিসন বেতন-বোনাস বাবদ নিয়েছিলেন ২ কোটি ২০ লাখ ডলার, যা প্রতিষ্ঠানটির গড় মধ্যম কর্মীর বার্ষিক বেতনের তুলনায় ৬৫৯ গুণ বেশি। এ সময় লো’সের গড় মধ্যম বেতন ছিল ৩০ হাজার ৬০৬ ডলার।

নির্মাণসামগ্রী বিক্রেতা আরেক বৃহৎ প্রতিষ্ঠান হোম ডিপো পাঁচ বছরে ৩ হাজার ৭৯০ কোটি ডলার শেয়ার পুনঃক্রয়ে ব্যয় করেছে। এ পরিমাণ অর্থে কোম্পানির ৪ লাখ ৭০ হাজার ১০০ কর্মীকে বছরে ছয়বার ১৩ হাজার ৪২৩ ডলার বোনাস দেয়া যায়। হোম ডিপোর গড় মধ্যম বেতন ৩৫ হাজার ১৯৬ ডলার।

সম্প্রতি এসঅ্যান্ডপি৫০০ সূচকে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সিইও থেকে কর্মী পর্যায়ে বেতনের ব্যবধান বিশ্লেষণ করেছে বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ম্যাডিসন ট্রাস্ট। ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, কোম্পানিগুলোয় কর্মীদের তুলনায় ২৬৮ গুণ বেশি বেতন পান সিইওরা। এতে শীর্ষ স্থানে রয়েছে মার্কিন খুচরা চেইন রস ড্রেস ফর লেস। কোম্পানি সিইও বারবারা রেন্টলারের বার্ষিক আয় ১ কোটি ৮০ লাখ ৯৪ হাজার ৯৪৪ ডলার। গড় মধ্যম কর্মী বেতন ছিল মাত্র ৮ হাজার ৬১৮ ডলার। অর্থাৎ গড় মধ্যম বেতনের তুলনায় প্রধান নির্বাহী ২ হাজার ১০০ গুণ বেশি আয় করেন।

তালিকায় তৃতীয় স্থানে থাকা কোকা-কোলার সিইও জেমস কুইন্সির আয় ২ কোটি ৪৭ লাখ ৪২ হাজার ৯০৮ ডলার। গড় কর্মীর বেতন ১৩ হাজার ৭৫২ ডলারের তুলনায় এটি ১ হাজার ৭৯৯ গুণ বেশি।

সিইও থেকে সাধারণ কর্মীদের বেতন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে তর্কবিতর্ক দেখা গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, একজন সিইওর বেতন কত হওয়া উচিত তা সঠিকভাবে নির্ধারণের কোনো উপায় নেই। তবে ধারণা করা হয়, বেতনের হার পারফরম্যান্সভিত্তিক হলে সিইওরা উচ্চ হারে আয় করেন।

সিইওদের বেতন নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ। অনেক সময় শীর্ষ পদের জন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকে। তাই শীর্ষ প্রতিভা আকৃষ্ট করতে উচ্চ বেতন ও বোনাসের প্রস্তাব দেয়া হয়।

সত্যিই কি একজন সিইওকে অতিরিক্ত বেতন পাওয়া উচিত, যখন তার নিচের স্তরের কর্মীরা কম উপার্জন করছেন? গবেষণা সংস্থা ডাটা ফর প্রোগ্রেস (ডিএফপি) এক জরিপে ৮০ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, সিইওকে গড় মধ্যম বেতনের তুলনায় ৫০ গুণ বা তার বেশি বেতন দিলে কোম্পানির কর বাড়ানো উচিত।

রিমোট জববিষয়ক প্রতিষ্ঠান ফেক্সজবসের এক জরিপ অনুসারে, ৮০ শতাংশ কর্মী মনে করেন সিইওরা অতিরিক্ত বেতন পাচ্ছেন। গত ফেব্রয়ারির ‘এমপ্লয়ি অ্যান্ড এক্সিকিউটিভ ডিভাইড সার্ভে’ শীর্ষক ওই জরিপে ২ হাজার ২০০-এর বেশি মার্কিন কর্মী অংশ নিয়েছিলেন। এতে প্রায় ৭০ শতাংশ কর্মী বলেন, ‘‌সিইওরা সঠিকভাবে কর্মক্ষেত্র পরিচালনা করতে পারেন না।’

বেতন ও নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা সংক্রান্ত উদ্বেগের এক পর্যায়ে কর্মীরা নিজেদের অবমূল্যায়িত মনে করেন বলে জানান ফেক্সজবসের ক্যারিয়ার বিশেষজ্ঞ টনি ফ্রানা। একে ‘দ্য গ্রেট ওয়ার্কপ্লেস ডিভাইড’ বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘নেতৃত্ব ও কর্মীদের চাহিদার মধ্যে ব্যবধান ক্রমে বাড়ছে। এর মধ্যে রয়েছে ন্যায্য বেতন, কাজের নমনীয়তা ও প্রতিনিধিত্ব প্রশ্নে ব্যবধান। এর পরিবর্তে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাই এবং অফিসে প্রত্যাবর্তনের কঠোর নীতি মেনে নিতে হচ্ছে।’

আরও